করিডোরে ‘বন্দি’ স্বাধীনতা

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

উত্তরাঞ্চলের লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার মানুষকে দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মাঝখানের তিনবিঘা করিডোর (প্যাসেস ডোর) ব্যবহার করতে হয়। ১৭৮ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৮৫ মিটার প্রস্থ তিনবিঘা করিডোরের বিনিময়ে আনুমানিক দুই দশমিক ৬৪ বর্গমাইল দক্ষিণ বেরুবাড়ি ছিটমহল ভারতকে ছেড়ে দেওয়ার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। সেই সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী ভারত পঞ্চগড়ের বেরুবাড়ি ছিটমহল পেলেও বাংলাদেশকে তিন বিঘা করিডোর স্থায়ীভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়নি।

১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি মূলত ভূমি সমস্যার সমাধানের নিমিত্তে করা হয়েছিল। ওই চুক্তির অনুচ্ছেদ ১-এর ধারা ১২ অনুযায়ী ছিটমহল বিনিময়ের কথা ছিল। ১৪ ধারায় উল্লেখ ছিল, ভারত দক্ষিণ বেরুবাড়ি ও নিকটবর্তী ছিটমহল লাগোয়া জমি পাবে, যার পরিমাণ আনুমানিক দুই দশমিক ৬৪ বর্গমাইল। বিনিময়ে বাংলাদেশ পাবে দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা ছিটমহল দুটি। একই সঙ্গে ওই ধারার শেষাংশে বলা ছিল দহগ্রামের সঙ্গে পানবাড়ি মৌজাকে যুক্ত করবার জন্য ১৭৮ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৮৫ মিটার প্রস্থ ভারতীয় জমি, যা তিন বিঘা করিডোর নামে পরিচিত, অনিঃশেষিতভাবে বাংলাদেশকে ইজারা দেবে ভারত। ওই চুক্তির বলে বেরুবাড়ি ভারতের এবং তিনবিঘা বাংলাদেশের ইজারাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণে থাকবে। বাংলাদেশের যতদিন প্রয়োজন ততদিন তিনবিঘার ইজারা বহাল থাকবে। চুক্তির মর্ম অনুযায়ী তিনবিঘায় নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের থাকার কথা।

প্রকৃতপক্ষে তা হয়নি। এখনও তিনবিঘা করিডোরের নিয়ন্ত্রণ ভারতের কাছে। শুধু কি তাই? দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা তিনবিঘা করিডোর ব্যবহারের অনুমোদন পাওয়ার জন্যও অপেক্ষা করতে হয়েছে ২০১১ সাল পর্যন্ত। করতে হয়েছে অনেক দেনদরবার। ১৯৯২ সালের ২৬ জুন বাংলাদেশ দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের অধিবাসীদের চলাচলের জন্য তিনবিঘা করিডোর দিয়ে রেশনিং পদ্ধতিতে এক ঘণ্টা পর পর মাত্র ছয় ঘণ্টা চলাচলের সুযোগ পায়। ১৯৯৯ সালে তিনবিঘা করিডোরের গেট সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সন্ধে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টা খুলে দেওয়া হয়। তারপরও দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসীকে প্রতিদিনই ১২ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকতে হতো। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকা সফরের সময় তিনবিঘা করিডোর বাংলাদেশিদের সার্বক্ষণিক ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার এবং তাৎক্ষণিকভাবে তা কার্যকরের ঘোষণা দেন। ওই সফরেই ১৯৭৪ সালের স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। যারই ধারাবাহিকতায় সম্পন্ন হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের ১৬২টি ছিটমহল বিনিময়। ছিটমহল বিনিময়ের পর দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার মানুষের কাছে তিনবিঘা করিডোর যেন নতুন করে পুরনো বেদনার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ১৬২ ছিটমহল বিনিময়ে আওতায় পড়ে না। এটি ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তিতে মীমাংসিত হয়ে আছে।

পাটগ্রাম উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহল নিয়ে ১৯৮৫ সালে একটি স্বতন্ত্র ইউনিয়ন ‘দহগ্রাম ইউনিয়ন’ গঠন করা হয় এবং ১৯৮৯ সালের ১৯ আগস্ট ইউনিয়ন পরিষদের উদ্বোধন হয়। সর্বশেষ ২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসে তিনবিঘা করিডোরের গেট আনুষ্ঠানিকভাবে ২৪ ঘণ্টা চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে যাওয়ার পর আন্ডার গ্রাউন্ড কেবলের মাধ্যমে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসী বিদ্যুতায়নের সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে। তবে স্বাধীনভাবে চলাচলে রয়েছে বাধা। দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায় উৎপাদিত কৃষিপণ্যসহ গরু-মহিষ তিনবিঘা করিডোর দিয়ে মূল ভূখণ্ডে আনতে হলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের চেকপোস্টে হিসাব দিয়ে আনতে হয়। একবার বাইরে আনতে পারলেও পরে ভেতরে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। তা-ও গবাদিপশু আনার জন্য বরাদ্দ রয়েছে সপ্তাহের দুটি দিন, শনি ও বুধ। দুদিনে মাত্র ৬০টি গরু বাইরে নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়।
ফলে রেশনিং পদ্ধতিতে প্রতি ওয়ার্ডে তিনটি করে গরু বিক্রির রশিদ দেওয়া হয়। এতে দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের নয়টি ওয়ার্ডে তিনটি করে মোট ২৭টি রশিদ পান ইউনিয়ন পরিষদের নয় মেম্বার। বাকি তিনটি দেওয়া হয় সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার তিন জনকে। তাই এ রশিদ বিতরণ নিয়ে প্রতিদিনই বাকবিতণ্ডা সামাল দিতে হয় জনপ্রতিনিধিদের। মারামারিও হয় মাঝেমধ্যে।

এমন একটা সময় ছিল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা থেকে হয়তো পাটগ্রামে বাজার করতে গিয়ে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা ৬টা পার হয়ে গেছে অনেকের। তিনবিঘা করিডোরের গেট ততক্ষণে বন্ধ। তাই বাধ্য হয়ে পাটগ্রামের কোনো গাছতলায় বসে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছেন তারা। সেই সব দিনে রাতে গর্ভপতি নারীদেরও চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে পারেননি পাটগ্রামে। এখন সমস্যাটা অন্যরকম।

৮৫ মিটার প্রস্থের তিনবিঘা করিডোরে রাস্তা মাত্র সাত ফুটের মধ্যে। কোনো রকম ভাবে ওই রাস্তা দিয়ে একটি মাইক্রো বাস গেলে রিকশা বা ভ্যানগাড়ি ক্রসিং করার উপায় থাকে না। এমন সময় পথ চলতে গিয়ে যদি রাস্তা থেকে কেউ মাটিতে পড়ে যায়, তাহলেও বিএসএফের নির্যাতন সইতে হয়। চলাচলের জন্য দহগ্রাম থেকে পাটগ্রাম পর্যন্ত একটা বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছিল একটা সময় কিন্তু মাত্র দুদিন পর ওই পথে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয় বিএসএফ।

বর্তমানে তিনবিঘা করিডোরে দুটি সিসি ক্যামেরা বসিয়ে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। আমি জানতে চাই, এটা কেমন স্বাধীনতা? চুক্তিমতে তিনবিঘা করিডোরের গেটটি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা ছিল। তিনবিঘা করিডোরে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের যে ফ্লাইওভার নির্মাণ করার কথা ছিল তাও দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন।

ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি অনুযায়ী তিনবিঘার নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের থাকার কথা। তিনবিঘায় ভারত এখনও যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, চুক্তি অনুযায়ী এ রকম নিয়ন্ত্রণের আইনগত সুযোগ তাদের নেই। প্রয়োজনে তারা সমঝোতার আলোকে ওভার পাস বা আন্ডার পাস করতে পারবেন।
এখন তিনবিঘা নিয়ে কথা বলার সময় এসেছে আমাদের। কারন পঁচাত্তরের পর দীর্ঘদিন এ নিয়ে কথা বলা হয়নি। যাদের দায়িত্ব ছিল ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের, তারা ক্ষেত্রবিশেষে সম্পর্কের অবনতি ঘটানোর কাজ করেছেন।

এই প্রচ্ছদটি লিখেছেনঃ আদমীন হোসেন বাঁধন ( সিনিয়র সহ-সভাপতি, ৫ নং ওয়ার্ড, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দহগ্রাম ইউনিয়ন শাখা )

Share.

একটি রিপ্লে দিন