ইতিহাস

ইতিহাস


বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে সম্পর্কের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল সিটমহল গুলো । বাংলাদেশের ভিতর ভারতের ১১৩টি এবং ভারতের ভিতর বাংলাদেশের ৫৩ টি সিটমহল ছিল তার মধ্যে সবচেয়ে বৃহত্তম এবং ব্যাতিক্রমধর্মী সিটমহল হচ্ছে দহগ্রাম সিটমহল (দহগ্রামের কোন সঠিক সুরহা হয় নি বলে একে এখনও সিটমহল বলা হচ্ছে) । এটি বাংলাদেশ এবং ভারতের সু-সম্পর্ক করেছে দৃঢ় । ব্যাতিক্রম বলা হয় এই অর্থে কারণ, একটি সাধারণ অঞ্চল এবং একটি সিটমহল এর মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে । তার মধ্যে হচ্ছে,

সিটমহল বাসীরা,

১। নিজের দেশেও থেকে পরবাসের জীবনযাপন করে ।

২। শিক্ষার অধিকার পায় না ।

৩। অর্থ, ব্যাবসা বাণিজ্য করতে পারে না ।

৪। নিজস্ব দেশের মূল ভুখন্ডের সাথে কোন রকম যোগাযোগ করতে পারে না ।

৫। নাগরিক সুযোগ সুবিধা এবং কিছু মৌলিক সুবিধা পায় না । যেমন : ভোটদান, নির্বাচন, পাসপোর্ট-ভিসা, সরকারী সাহায্য ইত্যাদি ।

৬। স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে না ।

৭। তারা নির্দিষ্ট কোন দেশের নাগরিক নয় ।

৮। চিকিৎসা সেবা,

ইত্যাদি ছাড়াও আরও অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত সিটমহল বাসীরা ।

সিটমহল সম্পর্কে হয়তোবা জেনে থাকবেন তারপরও জানিয়ে দেই ।

সিটমহল হচ্ছে এমন একটি ভূখণ্ড যেটি তার নিজস্ব মূল ভূখণ্ড হতে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন । যেটি এক দেশের হয়েও অন্য আরেক দেশের ভিতরে অবস্থিত । তারা উভয় দেশেরই সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে ।

দহগ্রাম এর ইতিহাস বলতে গেলে শুরুতেই চলে আসে ভারত মহাদেশের কথা যা শাসন করত ইংরেজরা । ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাজনের সময় এমনভাবে আন্তর্জাতিক সীমানা চিহ্নিত ও অঙ্কিত করা হয় যেখানে বাংলাদেশের কিছু অংশ ভারতে এবং ভারতের কিছু অংশ বাংলাদেশে রয়ে যায়। যা নিয়ে বিভিন্ন সময় মীমাংসা হওয়ার প্রচেষ্টা করা হলেও মীমাংসিত হয় নি এখনও । তার মধ্যে বৃহত্তম এবং ব্যাতিক্রমী সিটমহল হচ্ছে “দহগ্রাম”। এটি ব্যাতিক্রম এই অর্থে, কারণ বাংলাদেশের অন্যান্য সিটমহলগুলো তাদের নিজের দেশের সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেও এই সিটমহলটিতে আছে প্রায় সকল সুবিধা । সকল সিটমহল গুলোর মূল বৈশিষ্ট হচ্ছে, মূল ভূখণ্ডের সাথে কোনরকম যোগাযোগ না থাকা । কিন্তু দহগ্রাম বাসীরা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, যাওয়া আসা করতে পারে । তবে ১৯৯২ সালের ২৬ জুনের আগে এটিও ছিলো অন্যান্য সিটমহলগুলোর মতই । বিভিন্ন প্রক্রিয়া , জল্পনা-কল্পনা, আন্দোলনের মাধ্যমে এটি হয় ।

দহগ্রাম বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত হওয়ার আগে, ভারতের কুচলিবাড়ি ইউনিয়নের আওতায় ছিলো । ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ইন্দিরা গান্ধী একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন । চুক্তিতে সিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ও ভারত যথা শিগগির সম্ভব সিটমহল বিনিময় করতে সম্মত হয় । এ চুক্তি অনুসারে বেরুবাড়ির বিনিময়ে বাংলাদেশ দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা’র সাথে মূল ভূখণ্ড সংযোগ এর নিমিত্তে “তিনবিঘা করিডোর” চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হিসেবে পাবে । বাংলাদেশ ভারতকে বেরুবারি দিলেও, ভারত তাৎক্ষনিক ভাবে করিডোরটি বাংলাদেশকে দিতে পারে নি । ১৯৯০ সালে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট তিনবিঘা করিডোর ব্যাবহারের অনুমোদন দিলে, সেই সাল থেকে কাজ শুরু হয় এবং ১৯৯২ সালের ২৬ জুন তা ব্যাবহারের জন্য উম্মুক্ত করে দেওয়া হয় । কিন্তু ব্যাবহারেও রয়ে সীমাবদ্ধ । ২৪ ঘণ্টার মাত্র ৬ ঘণ্টা যাতায়াত করা যেত সেটি দিয়ে । দিনের ১২ ঘণ্টার ১ ঘণ্টা পর পর মোট ৬ ঘণ্টা । এরপর বিভিন্ন আন্দোলন এবং তৎকালীন দুই দেশের সরকারের স্বদিচ্ছায় ২০০১ সালের ২৭ এপ্রিল থেকে সেটি সকাল সারে ৬ টা হতে সন্ধ্যা সারে ৬ টা পর্যন্ত মোট ১২ ঘন্টা করে খোলা রাখা হয় এবং সর্বশেষ ২০১১ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর তখনকার ভারতীয় সরকার ড. মনমোহন সিং এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা’র পুর্ববর্তি বৈঠকের আলচনা অনুসারে খুলে দেওয়া হয় ২৪ ঘণ্টার জন্য ।

১৯৯২ সালে দহগ্রাম এর তিনবিঘা করিডোর খুলে দেওয়ার পর থেকে শুরু হয় উন্নয়ন কার্যক্রম । দহগ্রাম মুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত এখানে সংখ্যা গরিষ্ঠতায় ছিলো হিন্দু ধর্মালম্বীরা আর মুক্ত হওয়ার পর থেকে তারা দ্রুত ভারতে চলে যান এবং তখন বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসতে শুরু করেন মুসলিমরা এবং এক পর্যায়ে সংখ্যা গরিষ্ঠতা পায় তারাই এবং এখনও তা বিদ্যমান । তবে রয়ে যায় দু তিনটি হিন্দু পরিবার তবে বাহির হতেও আসেন কিছু হিন্দু পরিবার ।

তবে ১৯৯২ এর আগে এখানকার মানুষ এর দুঃখ কষ্টের কোন শেষ ছিলো না । দহগ্রাম বাসীর দুঃখের সামান্য একটি বর্ননা দেই । তারা সবাই পড়ালেখা, সু চিকিৎসা তো পেতই না বরং তাদের আয়ের কোন উৎসও ছিলো না । তারা কষ্ট করে জমিতে ফসল ফলালেও তা বিক্রি করতে পারত না বাইরে কোথাও । চুপি চুপি ভারতে নিয়ে বিক্রি করত অনেকে । আবার পণ্য আনার ক্ষেত্রেও ছিলো বাঁধা । তারপর ১৯৮৬ সালে ভারত হতে পণ্য আনার জন্য তৎকালীন BDR এবং BSF উচ্চ কর্মকর্তা কতৃক চুক্তি হয়, যে কোন ব্যাক্তি প্রতিবার ভারত হতে চাল আনতে পারবে মাত্র ৫ কেজি । কিন্তু বিক্রি করতে নিতে পারবে না ।

সে বছরেই অর্থাৎ ১৯৮৬ সালে দহগ্রাম ইউনিয়ন হিসেবে ঘোষণা করে তৎকালীন এরশাদ সরকার এবং সেবারই প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে এবং নির্বাচিত হন জনাব মোঃ সামসুল হুদা । ইউনিয়নের আগে এটি ছিলো মৌজা হিসেবে । সেখানে ভোটের মালামাল আনা হত অনেক কষ্ট করে ভারত দিয়ে দহগ্রামে ।

উন্নয়নের অংশ হিসেবে ১৯৯২ সালের পর থেকে শুরু হয় স্কুল, মাদ্রাসা, রাস্তা, বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ, হাসপাতাল ইত্যাদি নির্মানের কাজ । তবে পুর্বের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিলো, যেটি মুক্তিযুদ্ধের আগে প্রতিষ্ঠা হয়েছে ।

দহগ্রামের উন্নয়নের ও ইনডো-বাংলা সম্পর্কের উন্নতির লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীরা আসেন, যার মধ্যে শুধু এরশাদই আসেন ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বার ।

এছাড়া,

জিয়াউর রহমান- ১ বার

খালেদা জিয়া-  ১ বার

শেখ হাসিনা- ২ বার

সর্বশেষ বিদ্যুতায়ন সহ ২৪ ঘণ্টা করিডোর খোলা থাকলেও রয়েছে অনেক সমস্যা । যেমন,

গরু বিক্রয় নিয়ে সমস্যা । এখানকার মানুষের খুব প্রয়োজন হলেও সপ্তাহে মোট দুই কিস্তিতে ৬০ টির বেশি গরু নিয়ে যেতে পারবেনা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে । এর পুর্বে ছিলো মাত্র ১০ টি । তাছাড়া এখানকার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে জমি বিক্রয় নিয়ে । ইচ্ছে করলেই সহজে কেউ জমি বিক্রি করতে পারে না এখানকার মানুষ। কারণ এখানের জমির রেজিস্ট্রি হয় না । তাই বিকল্প পদ্ধতিতে ষ্ট্যাম্পের মাধ্যমে লেন দেন হওয়ায় দামও পান কম এবং অনেক সময় এসব নিয়ে দন্দ লেগেই থাকে ।

 

মুক্তিযুদ্ধে দহগ্রামঃ

মুক্তিযুদ্ধে দহগ্রামের এক বিশেষ ভুমিকা রয়েছে  । এখান থেকে সরাসরি যুদ্ধ না হলেও প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে গেছেন প্রায় ১০,০০০ (পর্যায়ক্রমে) মুক্তিযোদ্ধা । ৬ নং সেক্টরের আওতাভুক্ত দহগ্রামে একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছিলো, যেটির নাম ছিলো “ইয়ুথ ক্লাব” এবং এটি করা হয় তৎকালীন সৈয়দপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, যেটির বর্তমান নাম দহগ্রাম সঃ প্রাথমিক বিদ্যালয় । এই ক্যাম্পে ট্রেনিং এর দায়িত্বে ছিলেন কলকাতার “শিবরাজ শিবু” যাকে কমরেড বলে ডাকা হত । এখনও অনেক মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে এখানে।

(সংক্ষেপিত)

বিঃদ্রঃ ইতিহাসের এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয় এখানকার বাসিন্দাদের কাছ থেকে ।